পঞ্চায়েত - পর্ব ১
মাস দেড়েক হল শাহীন নতুন বাড়ি করেছে। আগের ঘরটি এখন অনেকটাই বৈঠক ঘরের মত ব্যবহার করছে সে। পুরনো খাবার টেবিল, তার সাথের কাঠের চেয়ারগুলো এই ঘরের আসবাব।
– বসারও ভালো ব্যবস্থা করতে পারিনাই, স্যার।
চেয়ারটা কোনো রকম হাত দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে শাহীন গ্রামের হাই স্কুলের হেডমাস্টারকে বসতে বললেন। নিজেও আরেকটি চেয়ারে বসলেন। অন্য সাহেব সরদাররাও বসল। তাদের সাথে আসা আরো বেশ কজন ফ্লোরেই বসেছে। কেও কেও দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্য থেকেই একজনকে হাতে ইশারা করে ঘরের দিকে যেতে বললেন শাহীন। হেডমাস্টার সাহেবকে বিশেষ কদর করার কারণ আছে শাহীনের। তার যতদূর পড়াশোনা তার সবটাই এই স্যারের জন্য। তিনি তখনকার আমলেই বিএসসি পাশ। গ্রামের হাই স্কুলে কেনো আরো কয়েক গ্রাম মিলিয়ে যে কলেজটা সেখানেই যখন কোনো বিএ পাশ করা শিক্ষক ছিলেন না তখনই তিনি হাই স্কুলে নিযুক্ত হোন।
– নতুন ঘর তুলছো, আস্তে আস্তে সবই হইব।
– মাস্টার সাব, অখন এগো একটা বিহিত করেন আগে আপ্নেরা।
মোসলেম মেম্বারের কাছে সময়ের মূল্য অনেক। তাই তিনি চান আগে কাজের কথা শেষ হোক। তিনি প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন নিজেই।
– এগো বিহিত কি হইব আর? গ্রামছাড়া করা ছাড়া তো আর কিছুই করার নাই।
মিলিটারি মতিন কঠোর লোক। তার শাসন বেশ করা। সংগ্রামের সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। গুলি চালাতে তিনি ভয় পান নাই। গ্রাম ছাড়া করা তো তেমন কিছুই না তার কাছে।
– একটা সুযোগ দেয়া যায়না? দেখেন চিন্তা ভাবনা কইরা।
– তুমি মিয়া চুপ থাকো। সব পাপে সুযোগ দেয়া যায়না। এগো শাস্তি হওন দরকার। ওগো মত বুঝওয়াল ছি ছি ছি। পোলাপানরা কী শিখব? মতিন সাহেব শহীদকে খুব ভালো ভাবে চিনেন।টাকা খেয়ে সে আসছে। ওকে বেশি কথা বলতে দেয়া যাবেনা।
– কবিরের লগে কথা কইস কেও? সে কি কয়?
– সে কি কইব? ওর কথায় ত সবকিছু হইবনা।
– না। ওর পরিবার। ওর একটা সিদ্ধান্ত আছে না??
– এইডা এখন আর পারিবারিক নাই। এইডা সামাজিক একটা অপরাধ। এইডার বিহিত সমাজেরই করতে হইব।
মতিন সাহেব আর হেডমাস্টারের কথায় বাঁধ বসিয়ে শাহীন বলল, এখন ইমামসাব, হেডমৌলবিদের ডাইকা কথা বললে ভাল ছিলনা?
সচারচর সে কম কথা বলে। বিচার শেষে যখন সবার মতামত জিজ্ঞাসা করে তখন সে সিদ্ধান্ত দেয়। ইদানিং সে তার স্বভাব-চরিত্র বদলাচ্ছে। নামাজ পড়ছে নিয়মিত, পান- সিগেরেট খাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী বছর হজে যাবে।
– হ। শরীয়ত কি বলে অইডাও দেখন দরকার। মতিন সাহেবের সম্মতি। শাহীন যে ছেলেটিকে ইশারা করে বাড়ির ভিতরে যেতে বলেছিলেন সে চা আর বিস্কিট নিয়ে ঘরে ঢুকল।
– স্যার, চা নেন।
মাস্টার সাহেব ছাড়া বাকিরাও চা নিল।
– তা এখন মেলডা বসাইবা কবে?
– বৃহস্পতিবার আসরের পরেই দেন।
– তাইলে কাসেমরে কইয়া দেও।
– স্যার, কালকে থেইকা বাড়িত মেহমান থাকব। নাতি নাতনি গুলার ছুটি পড়সে সবাই বাড়িত আসব।
– তাইলে কি মিটিং অন্যখানে বসানের কথা কইতাসো?
– অইডাই করেন স্যার একটু কষ্ট কইরা।
– হ, সবারই ত সমস্যা থাকে। তো এখন কই ফালামু মেলডা? মতিন সাহেব বললেন যা গো সমস্যা তারার বাড়িই তো খালি, ওনেই দেন?
– তাইলে বৃহস্পতিবার আসরের পর কামালগো উঠানে মেল?
– হ, হ। হুনসো কাসেম??
কাসেম গ্রামের চৌকিদার। সে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল সে শুনেছে।
– তো এখন উঠি।
বলে মাস্টার সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে বের হয়ে গেলেন। বাকিরাও নিজেদের মধ্যে চোখে- চোখে কিংবা নিচু স্বরে কিছু বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসলেন।
শাহীন চেয়ারেই বসে ছিল। সবাই ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর যখন চেয়ার থেকে উঠতে নিচছে তখনই শেলী ঘরে ঢুকল।
– বিহিত হইল কিছু?
– বিহিত কি হইব?
– কামালের মা আজকে আইসাও কথকন কানছে। এহনো বলে কামালরে হুনায় নাই।
– কামাল হুনেনাই কে কইল? কালকেই তো আমার কাছে ফোন দিসিল।
– তাইলে মুনয় অন্য কেও কইসে।
– হ। এসব কতা ত ভাল কথার আগে ছড়ায়।
– বিকালের আসার সম ডাল নিয়া আইসেন। বলে চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে শেলী বের হয়ে গেলো।
Enjoy Reading This Article?
Here are some more articles you might like to read next: